দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ঝুঁকি নিয়ে শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সতর্কবার্তার পর বিশ্বজুড়ে এআই-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ারে বড় দরপতন হয়েছে। সোমবারের এই পতনকে এআই খাতে বিনিয়োগ করা বিপুল অর্থের ওপর এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এআই-নির্ভর বিনিয়োগের জেরে সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাজারের সূচকগুলো রেকর্ড উচ্চতায় উঠেছিল।
অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত দীর্ঘ এক নিবন্ধে এআই মডেলের সক্ষমতা বাড়ানোর গতি কমানোর আহ্বান জানান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার প্রেক্ষাপটে তিনি এ আহ্বান জানান। এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক এবং ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও আমোদেইয়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেন। অল্টম্যান জানান, নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে চলতি বছর ওপেনএআইকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা এগোবে না।
প্রযুক্তি খাতে ঋণনির্ভর অর্থায়ন ও একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক অর্থায়নের মাধ্যমে এআই অবকাঠামো তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। একই সময়ে এ খাতে ব্যয়ের পূর্বাভাসও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে বৈশ্বিক ঋণের সুদহার বহু বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠায় বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
সুইসকোটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ইপেক ওজকারদেস্কায়া বলেন, এআইয়ের প্রতিযোগিতা যদি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর হয়ে যায়, তাহলে বড় প্রশ্ন দাঁড়াবে—এই বিপুল অবকাঠামোর খরচ কে বহন করবে? এআইয়ের চাহিদা ও আয় প্রত্যাশা কমলেও অবকাঠামোর ইজারা, ঋণ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের দায় থেকে যাবে। ফলে এআই খাতে ঋণঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
ওয়াল স্ট্রিটের নাসডাক সূচকের সঙ্গে সম্পর্কিত ভবিষ্যৎ চুক্তির দাম ১ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। এআই খাতের উত্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে। এনভিডিয়ার শেয়ার ৩ শতাংশ, অ্যাডভান্সড মাইক্রো ডিভাইসেসের ৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ইলন মাস্কের স্পেসএক্সের ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে। মেটা ও অ্যামাজনের মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও ১ দশমিক ৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
ইউরোপের প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের সূচক ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। চিপ নির্মাণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী এএসএমএলের শেয়ার কমেছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। ইনফিনিয়নের শেয়ার কমেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এবং এআই অবকাঠামো সরঞ্জাম নির্মাতা সিমেন্স এনার্জির শেয়ার কমেছে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।
এশিয়াতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ওপেনএআইয়ের বিনিয়োগকারী সফটব্যাংকের শেয়ার একপর্যায়ে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির শেয়ার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্সের শেয়ার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে।
আমোদেই সতর্ক করে বলেন, আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এআই এজেন্টগুলো পুরো ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। এর ফলে শত শত বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার অ্যানথ্রপিক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের ক্লড এআই মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন পক্ষ অস্ত্র উন্নয়ন, সাইবার কার্যক্রম, নজরদারি ও প্রতারণার মতো কাজে যুক্ত হয়েছে।
এআইয়ের সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ে অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সনের পদত্যাগের পর। তিনি দাবি করেন, এআই তৈরি করা ব্যক্তিদের কেউ কেউ বিশ্বাস করেন, চলতি দশকের শেষ নাগাদ এই প্রযুক্তি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানও এক সাক্ষাৎকারে এআইয়ের কারণে মানবজাতির বিলুপ্তির ঝুঁকিকে অগ্রহণযোগ্য বলে মন্তব্য করেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এআই নিয়ে সমালোচনাকারীদের নেতিবাচক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, তারা এমন কিছু পরিস্থিতির কথা বলছেন যা ঘটবে না। একই সঙ্গে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে এআই শিল্পে বিশ্বনেতৃত্ব ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
২০২২ সালে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর থেকেই এআই-সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের উত্থানের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এআই এজেন্টের মাধ্যমে সাইবার হামলা এবং ডেটা সেন্টার নির্মাণ নিয়ে জনঅসন্তোষ এ শিল্পের দ্রুত সম্প্রসারণের বিরোধিতা বাড়িয়েছে।
তবে সব বিনিয়োগকারী এআই নিয়ে সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের আগে মার্কিন আবাসনবাজারের পতনের পূর্বাভাস দিয়ে আলোচিত বিনিয়োগকারী মাইকেল বারি এসব সতর্কতাকে অতিরঞ্জিত প্রচারণা বলে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে মর্গ্যান স্ট্যানলির ব্রায়ান নওয়াকের পূর্বাভাস, ২০২৭ সালের মধ্যে এআই খাতে বিনিয়োগ ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ডয়চে ব্যাংকও বলেছে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের চক্র এখনই থেমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রতিষ্ঠানটির মতে, কোম্পানি ও দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা এতটাই তীব্র যে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এগিয়ে যাওয়ার সময় কোনো প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় পিছিয়ে আসবে—এমনটা কল্পনা করা কঠিন।
তবে এআই নিয়ে শীর্ষ নির্বাহীদের সতর্কবার্তার প্রভাব স্বল্পমেয়াদে শেয়ারবাজারে থেকে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। স্যাক্সো ব্যাংকের প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা বলেন, এআই ও চিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্যায়নে শক্তিশালী চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ধরে নেওয়া হয়েছে। প্রত্যাশা যখন এত বেশি, তখন সামান্য বিলম্বের আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
এমএস/